• শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৩ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

সিসিটিভি ফুটেজ, মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল তাজমিনের সঙ্গে

Reporter Name / ২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। একটি সিসিটিভি ক্যামেরার তাজমিনের মৃত্যুর আগের রাতের চলাচলের ফুটেজ মিলেছে।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নামে তাজমিন। বাসটি কক্সবাজার থেকে ফিরছিল। এরপর হোটেলের পাশের খাবার দোকান ও পশ্চিম পাশে কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায় সে। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলে। এ সময় দোকানিকে তাকে কিছু একটা দেখাতে বা কোনো দিক নির্দেশ করতে দেখা যায়।

ফুটেজে আরও দেখা যায়, রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু একটা দেখানোর পর তাজমিন সেখান থেকে সরে অন্য পাশে যায়। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। তবে এলাকা ছাড়ার পর তাজমীন কোন পথে গিয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তার চলাচলের পথ এবং সম্ভাব্য যাতায়াতের মাধ্যম নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।

নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর তাজমিন কোথায় গিয়েছিল, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না এবং জব্দ করা মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে সামান্য দূরে পড়ে থাকা ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক- এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

এদিকে জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাস্থলে মিলেছে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে স্কুলছাত্রী তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে এলোমেলো হয়ে আছে ধানগাছ। পাশে পড়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা। স্থানীয়দের ধারণা, প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেছিল তাজমিন। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্ত করছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সরেজমিন দেখা যায়, লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গেছে একটি নির্জন পাকা সড়ক। সড়কের দুপাশে বিস্তৃত ফসলি জমি। সড়কের মধ্যবর্তী স্থানের দুপাশে অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন রয়েছে। ধানগাছগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। সড়কের এক পাশে ধানক্ষেতে পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পরে স্থানীয়রা সেটি টেনে সড়কের ওপর তোলেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, সকালে আশপাশের মানুষের কাছে শুনতে পান ধানক্ষেতে একটি সিএনজি পড়ে আছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি বিষয়টি দেখতে পান। সিএনজিটির ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে ছিল। আশপাশের ধানক্ষেতগুলোতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির চিহ্নও দেখতে পান তিনি। সেই চিহ্ন অনুসরণ করে সামনে একটি ধানক্ষেতে গিয়ে এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।

রুহুল আমিন বলেন, লাশের মাথা কাদায় গাড়ানো ছিল। পুরো শরীর বস্ত্রহীন ছিল। গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। পরে দলে দলে মানুষ মরদেহ দেখতে আসতে থাকলে তিনি একটি গামছা দিয়ে শরীর ঢেকে দেন। এ সময় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ উদ্ধার করে।

স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে কাঁচিকাটা-হরিশ্চর পাকা সড়কের জগতপুর উত্তরপাড়া এলাকার মানুমুড়া সংলগ্ন স্থানে একটি সিএনজি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। এতে তাদের সন্দেহ হয়। পরে সড়ক থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে ফসলি জমিতে গিয়ে আইলের পাশে এক কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান। মরদেহটির গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। মুখ মাটিতে চেপে রাখা অবস্থায় ছিল। খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সিআইডি ও পিবিআইসহ পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।

ঘটনাস্থলের চিত্র দেখে স্থানীয়দের ধারণা, তাজমিনকে হত্যার আগে ধস্তাধস্তি হয়ে থাকতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. মুহিন বলেন, যারাই মেয়েটিকে মেরেছে, তারা মেয়েটিকে অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছে। সেটি ধানক্ষেতের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। মেয়েটি সম্ভবত নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছিল; কিন্তু পেরে ওঠেনি।

তিনি আরও বলেন, কিন্তু একটা জিনিস বুঝে উঠতে পারছি না, সিএনজিটি কেন এভাবে ধানক্ষেতে পড়েছিল। সিএনজিটি যদি হত্যাকারীদের হয়ে থাকে, তবে তারা সেটি ফেলে গেল কেন।

নিহতের বাবা আবদুল আলীম জানান, ৪ দিন আগে (৪ অক্টোবর) তার একমাত্র মেয়ে তাজমিন কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্সের ধানমন্ডি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়। সে শহরের এক বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলেছিল। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায়। সেখান থেকে বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় তাজমিন। রাতে তার বাবা আবদুল আলীম মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেন। কিন্তু কল রিসিভ না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, বুধবার রাত আনুমানিক পৌনে দুইটার দিকে তার মেয়ে মোবাইলে মেসেজ এবং ‘লাইভ লোকেশন’ (ওই সময় মেয়েটির অবস্থান যেখানে ছিল) পাঠায়। মেসেজে তাকে এসে নিয়ে যেতে বলে। তিনি বলেন, ‘তখন আমি ঘুমে ছিলাম। পরে সকালে মেসেজ দেখি। তারপর লাইভ লোকেশনে এসে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই।’

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, আমি তাকে দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। সে খুবই চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা কিছুটা অসুস্থ থাকায় দুই যমজ ভাইয়ের দেখভাল করত তাজমিন। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এ কারণে তার বাবা সকালে বাসা থেকে বের হলে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন। ঘরে রাগ হলে সে হুটহাট করে বাসা থেকে বের হয়ে যেত। তার দাবি, ঘটনার তদন্ত হয়ে দোষীদের শাস্তি হোক, সেটাই চাই।

এদিকে পুলিশি অনুসন্ধানে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। তবে এসব স্থানে তার সঙ্গে কেউ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

লালমাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রথমে মরদেহটি অজ্ঞাত ছিল। পরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ বলেন, সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয়েছে। নিহতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। গলায় গামছা পেঁচানো ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলে হত্যার বিবরণ জানা যাবে।

তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা সিএনজি চালিত অটোরিকশাটি রেজিস্ট্রেশনকৃত। আমরা সেটির সূত্র ধরে এগোচ্ছি। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।

এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, আমরা ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করছি। আশা করি, রহস্য উদ্ঘাটন হবে।

এদিকে, নিহত তাজমিনের মরদেহ নিয়ে যশোরে গ্রামের বাড়ি পৌঁছেছেন তার স্বজনরা। ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে কুমিল্লা থেকে যশোরের উদ্দেশে রওনা দেন তারা। যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা এলাকায় নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে কুমিল্লায় বেড়ে ওঠা তাজমিন কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে আর স্কুলে যায়নি বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তার বাবা আব্দুল আলিম ঔষধ কোম্পানির কুমিল্লা রিজিয়নে চাকরি করেন।

তারা কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। এ ঘটনায় নিহত তাজমিনের বাবা আব্দুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।

সূত্র: কালবেলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bditwork.com