দেশের আট বিভাগে ২০টি সরকারি খালকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘মডেল খাল’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খাল পুনঃখননের পর সেগুলোকে পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি মাছ ও হাঁস চাষ, খালপাড়ে সামাজিক বনায়ন, মৌসুমি সবজি উৎপাদন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
এ কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ১৯ নভেম্বর লালমনিরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মসূচিটি উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত ধারণাপত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
‘শুধু খাল খনন নয়; খননকৃত খালের বহুমুখী ব্যবহার’- এই ধারণাকে সামনে রেখে কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর লক্ষ্য সরকারি জলসম্পদকে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে পরিণত করা, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ-সহনশীল জীবিকা গড়ে তোলা এবং অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘শুধু পানি নিষ্কাশন নয়- খালপাড়ে বৃক্ষরোপণ, পানিতে হাঁস ও মৎস্য চাষ এবং কুটির শিল্পের সুযোগ তৈরি করে এসব খালের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। এজন্য আমরা ‘মডেল খাল’ কর্মসূচির ধারণা চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
কেন এই ‘মডেল খাল’ কর্মসূচি?
ধারণাপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, নদী-নালা ও খাল পুনঃখননের চলমান কর্মসূচির পাশাপাশি দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি জলসম্পদ পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
খালের পানি ধারণক্ষমতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ অক্ষুণ্ণ রেখে খালপাড়ে সামাজিক বনায়ন, হাঁস ও মাছ পালন, মৌসুমি সবজি চাষ, জনসাধারণের বৈধ ব্যবহার এবং নৌচলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
এ কর্মসূচির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তাকে শুধু সাহায্য বা ভাতানির্ভর না রেখে উৎপাদনশীল জীবিকার মাধ্যমে মানুষকে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ-সহনশীল অর্থনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান আইনগত, প্রশাসনিক ও কারিগরি এখতিয়ার অক্ষুণ্ণ রেখেই পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালার আলোকে কর্মসূচিটি পরিচালিত হবে।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, দেশের কৃষিজমিতে সেচসুবিধা বৃদ্ধি, পানিসম্পদ সংরক্ষণ এবং কৃষি উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের কার্যক্রম চলছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’র অনুসরণে জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া নদী, খাল ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, পুনঃখননের পর নিয়মিত তদারকি ও সমন্বিত সামাজিক ব্যবহারের অভাবে খালগুলো যেন আবার অবৈধ দখল, আবর্জনা ফেলা কিংবা পলি জমে ভরাট হয়ে না যায়, সে লক্ষ্যেই ‘মডেল খাল’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘খালপাড়ের উপকারভোগী দরিদ্র জনগোষ্ঠী যখন নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, তখন দরদ দিয়ে তারা নিজেরা খাল পাহারা দেবেন ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন কর্মচঞ্চলতা সৃষ্টি করবে।’
৮ বিভাগে ২০ খাল, উপকারভোগী নির্বাচন যেভাবে
প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে দেশের আট বিভাগের ২০টি নির্বাচিত খালকে মডেল হিসেবে নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে তিনটি করে এবং রংপুর, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে দুটি করে খাল নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রতি খালের গড় দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটার ধরে মোট আনুমানিক ৬০ কিলোমিটার খালকে এ কার্যক্রমের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আগে পুনঃখনন করা হয়েছে- এমন খাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে মডেল খাল হিসেবে নির্বাচিত হবে না।
প্রতিটি জেলার প্রাপ্ত প্রস্তাবনার মধ্য থেকে জিপিএস স্থানাঙ্ক, জমির খতিয়ান, দখল পরিস্থিতি, পানিপ্রবাহ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের চাষাবাদের উপযোগিতা যাচাই করে চূড়ান্ত ২০টি খাল নির্বাচন করা হবে।
রূপরেখায় বলা হয়েছে, স্থানীয় অতিদরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি), নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রতিবন্ধী সদস্যসম্পন্ন দরিদ্র পরিবার থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে।
খালের কোন অংশে কী হবে?
খালের পরিবেশ ও স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রেখে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন ‘জোন’ নির্ধারণের মাধ্যমে বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, খালের নির্দিষ্ট অংশ স্থানীয় জনগণ ও গবাদিপশুর গোসল এবং গৃহস্থালি কাজে পানি সংগ্রহের জন্য ‘পাবলিক জোন’ হিসেবে উন্মুক্ত থাকবে।
খালের গভীর ও উপযোগী অংশে দেশীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শে নিয়ন্ত্রিতভাবে হাঁস পালনের জন্য ‘প্রোডাকশন জোন’ তৈরি করা হবে। নৌযান চলাচলের সুযোগ রয়েছে, এমন খালে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের জন্য রাখা হবে ‘ন্যাভিগেশন চ্যানেল’।
এছাড়া খালের দুই পাড়ের মাটি ধসে পড়া রোধে জলসহিষ্ণু ও ফলজ গাছ লাগিয়ে ‘সোশ্যাল ফরেস্ট্রি’ বা সামাজিক বনায়ন করা হবে। খালের পাড়ের ঢালু অংশে মাচা পদ্ধতিতে মৌসুমি সবজি চাষের সুযোগও রাখা হবে।
কর্মসংস্থান, স্থায়ী জীবিকা ও সমবায়
প্রস্তাবিত কর্মসূচির আওতায় ২০টি মডেল খালে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে সম্পৃক্ত করা হবে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে অন্তত ৫০ শতাংশ নারী সদস্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
তবে কোনো উপকারভোগী বা সমবায়কে খাল, খালের পাড়ের জমি কিংবা সরকারি অবকাঠামোর ওপর স্থায়ী স্বত্ব দেওয়া হবে না। তাদের কেবল শর্তসাপেক্ষ ও অ-হস্তান্তরযোগ্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।
১০ কোটি টাকার ঘূর্ণায়মান তহবিল
ধারণাপত্র অনুযায়ী, পৃথক কোনো বৃহৎ প্রকল্প ছাড়াই বিদ্যমান সরকারি কাঠামোর আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রাথমিক বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ অর্থ কোনো স্থায়ী অনুদান বা দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকি হিসেবে নয়, বরং ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে পরিচালিত হবে।
সরকারের প্রাথমিক সহায়তায় উৎপাদন শুরু হওয়ার পর অর্জিত আয় থেকে স্থানীয় সমবায়গুলো নিজেদের পরিচালন ব্যয় বহন করবে। এর মাধ্যমে সরকারি আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি থাকবে। কর্মসূচিটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ১২ মাস পরিচালনার পর স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সারা দেশে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সেখ ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘মডেল খালের মূল ভিত্তি হলো স্থানীয় নিবন্ধিত হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে সুসংগঠিত করে সমবায় সমিতি গঠন করা। কর্মসূচির শুরুর প্রথম দুই বছর সরকার প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ, উৎপাদন উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেবে। পরীক্ষামূলক পর্ব শেষে এসব খালের উৎপাদন, আর্থিক আয় ও তৈরি হওয়া সম্পদের ওপর সমবায়ের স্থানীয়দের সরাসরি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যা তাদেরকে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে।’
সূত্র: বাসস