যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় বসবাসকারী একটি পরিবারকে ঘিরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক মর্মান্তিক ও বিরল অভিজ্ঞতা সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। মায়ের মৃত্যুর পর একে একে পাঁচ ভাইবোনের জীবনে নেমে আসে এক চরম বিপর্যয়, যা তাঁদের চোখের সামনে পুরোপুরি বদলে দেয়। বয়স চল্লিশের ঘরে পৌঁছানোর পর থেকেই তাঁদের মধ্যে অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করা যায়। সন্তানদের প্রতি চরম উদাসীনতা, জীবনসঙ্গীর সঙ্গে রুক্ষ আচরণ এবং সামাজিক শিষ্টাচার ও মূল্যবোধের লোপ পাওয়ার মতো লক্ষণগুলো পরিবারটিকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে। এই আকস্মিক পরিবর্তনের পেছনে কোনো মানসিক রোগ নয়, বরং একটি বিরল ধরনের ডিমেনশিয়া কাজ করছে বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন।

পরিবারের এই হৃদয়বিদারক কাহিনিটি সম্প্রতি লেখক রবার্ট কোলকারের ‘দ্য ভ্যানিশিং ফ্যামিলি: লাভ, ফেইট, অ্যান্ড দ্য কোয়েস্ট টু এন্ড ডিমেনশিয়া’ নামক নতুন বইটিতে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে লেখক একই ধরনের আরেকটি পরিবার নিয়ে বই লিখেছিলেন, যেখানে ছয় ভাইবোনের সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছিল। নতুন এই বইটিতে মূলত ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া বা এফটিডি নামক বিরল স্বাস্থ্য সমস্যাটির ভয়াবহ রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাধারণত ডিমেনশিয়া রোগীদের মধ্যে এই বিশেষ ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব পাঁচ শতাংশের কম এবং এটি আলঝেইমারের তুলনায় অনেক কম বয়সে মানুষের ওপর আঘাত হানে। এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রাথমিক পর্যায়ে স্মৃতিশক্তি হারানোর চেয়ে রোগীর আচরণ ও ব্যক্তিত্বে ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে এমএপিটি নামক একটি জিনের মিউটেশন বা ত্রুটি সরাসরি দায়ী থাকে। এই নির্দিষ্ট জিনটি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের স্বাভাবিক কাঠামো ও কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে সাহায্যকারী টাউ প্রোটিন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। জিনে ত্রুটি দেখা দিলে মস্তিষ্কে ক্ষতিকর মাত্রায় টাউ প্রোটিন জমা হতে শুরু করে এবং রোগীর মধ্যে এই মারাত্মক রোগ বাসা বাঁধে। পরিবারের কোনো সদস্যের শরীরে এই ত্রুটিপূর্ণ জিন থাকলে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ। পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্য বার্ব নিজের শরীরেও এই জিন থাকার আশঙ্কায় সবসময় এক চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাতে থাকেন।

বইটিতে পরিবারের সদস্যদের জিনগত পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত এবং তা নিয়ে তৈরি হওয়া মানসিক দ্বন্দ্ব অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সত্য জানার তীব্র কৌতূহল এবং ভবিষ্যতের নির্মম পরিণতি জানার ভয়—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে বার্ব ও তাঁর স্বজনেরা চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। তবে শত হতাশার মাঝেও বইটির শেষাংশে আশার আলো দেখতে পান পাঠকরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর ভরসা রেখে এবং এই রোগের স্থায়ী প্রতিকার খুঁজে বের করতে বার্বসহ আক্রান্ত অন্যান্য পরিবারগুলো একত্রিত হয়ে ‘কিউর এমএপিটি এফটিডি’ নামের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে চিকিৎসকরা টাউ প্রোটিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এই রোগের গতি ধীর করার বিভিন্ন নতুন পদ্ধতি নিয়ে নিবিড় গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।