কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় অনলাইন জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে বন্ধু রাজা হোসেনকে নির্মমভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। সম্প্রতি কামালপুর সাতবিল মাঠ এলাকার একটি নির্জন সড়ক থেকে রাজার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় কৃষকরা মাঠে গিয়ে শিয়ালকে একটি মরদেহ ঘিরে টানাটানি করতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে খড় ও ঘাসের নিচ থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে। দীর্ঘক্ষণ নিখোঁজ থাকার পর পরিধেয় পোশাক, স্যান্ডেল ও হাতঘড়ি দেখে নিহতের পরিবার মরদেহটি রাজা হোসেনের বলে নিশ্চিত করে। পুলিশ ও সিআইডি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে। নিহত রাজা হোসেন স্থানীয় বাসিন্দা ইমাম আলীর ছেলে এবং অভিযুক্ত রিফাছ হোসেন একই এলাকার সফেদ হোসেনের সন্তান। ঘটনার আকস্মিকতায় নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকেই নিখোঁজ ছিলেন রাজা হোসেন। এই ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে দৌলতপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর সন্দেহভাজন চার যুবককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ। তাঁদের মধ্যে নিহতের বন্ধু রিফাছ হোসেনকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পুলিশের দাবি, অনলাইন জুয়া খেলায় বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন রিফাছ। এই সংকট উত্তরণের পথ খুঁজতে গিয়ে তিনি বন্ধু রাজাকে অপহরণ করে টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেন। অপর তিনজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হলেও রিফাছকে ওই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। নিহতের বাবা বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত রিফাছ হোসেন মূলত নিহত রাজার মাধ্যমেই অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। জুয়ায় সর্বস্ব হারানোর পর তিনি বন্ধু রাজাকে ফাঁদে ফেলার ছক কষেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রাজাকে ডেকে নিয়ে প্রথমে একসঙ্গে মাদক সেবন করা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে নেট বা জালজাতীয় বস্তু দিয়ে শ্বাসরোধ করে রাজাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর মৃতদেহটি টেনে নির্জন স্থানে নিয়ে খড় ও ঘাস দিয়ে ঢেকে রাখেন রিফাছ। শুধু তাই নয়, হত্যার পর রাজার নিজস্ব মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তাঁর পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ বা টাকা দাবি করা হয়েছিল। শিয়ালের টানাটানিতে মরদেহের অংশবিশেষ খড়ের বাইরে চলে আসায় এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, উদ্ধারকৃত মরদেহটি কয়েকদিনের পুরোনো হওয়ায় ইতিমধ্যে পচন ধরেছিল এবং শিয়ালের কামড়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গ্রেপ্তার রিফাছ হোসেনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ভেড়ামারা-দৌলতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। তবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ কাজ করছে। রিফাছের দেওয়া তথ্য এবং সংগৃহীত আলামত যাচাই-বাছাই করে এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।