বর্তমান বিশ্বে মানুষের দৈনন্দিন ক্যালরির চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ হয় ধান, গম এবং ভুট্টার ওপর নির্ভর করে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, তীব্র খরা ও নানা ধরনের রোগবালাইয়ের কারণে প্রধান এই খাদ্যশস্যগুলো প্রতিনিয়ত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই বাস্তবতায় গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এমন কিছু বিকল্প ও কম পরিচিত উদ্ভিদের সন্ধান করছেন, যা আগামীদিনের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় উৎপাদিত এনসেট নামক বিশেষ উদ্ভিদটি বর্তমানে বৈশ্বিক গবেষকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। এটিকে অনেকেই ক্ষুধা নিবারণকারী অলৌকিক ফসল কিংবা মিথ্যে কলা হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন।

ظاهری দিক দিয়ে গাছটি দেখতে অনেকটা সাধারণ কলাগাছের মতো হলেও এটি মূলত এক ধরনের বিশাল আকৃতির ভেষজ উদ্ভিদ। বুনো প্রজাতির এই উদ্ভিদ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিলেও খাদ্য হিসেবে এর চাষাবাদ প্রধানত ইথিওপিয়ার পার্বত্য অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের কিউ গার্ডেনের সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী জেমস বোরেলসহ একদল গবেষক এই উদ্ভিদের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, উদ্ভিদটির চরম আবহাওয়া সহ্য করার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে এবং এটি বহুবর্ষজীবী হওয়ায় প্রতিবছর নতুন করে বীজ বপনের ঝামেলা পোহাতে হয় না।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ষাটটি এনসেট গাছ একটি পাঁচ সদস্যের পরিবারের এক বছরের খাদ্য চাহিদা অনায়াসেই মেটাতে সক্ষম। এই উদ্ভিদটির কাণ্ড ও মাটির নিচের অংশ প্রক্রিয়াজাত করে ইথিওপিয়ায় কোচো ও বুল্লার মতো বেশ কিছু জনপ্রিয় খাবার তৈরি করা হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সাব-সাহারান আফ্রিকার উপযুক্ত পরিবেশে এই উদ্ভিদের চাষ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে প্রায় এগারো কোটি মানুষের বাড়তি খাদ্যের জোগান দেওয়া যেতে পারে। তবে দেখতে কলার মতো হলেও এর ভেতরের অংশ খাওয়ার উপযোগী নয় এবং ফলগুলো শক্ত কালো বীজে পরিপূর্ণ থাকে।

এতসব সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ইথিওপিয়ার বাইরে এই ফসলের ব্যাপক বিস্তার না ঘটার পেছনে বেশ কিছু বাস্তব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। দেশটির কঠোর জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ নীতি এবং উদ্ভিদ রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইনি বিধিনিষেধ এর বড় কারণ। এছাড়া ফসল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং এর জন্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অর্জিত বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। সম্প্রতি শহরায়ণ ও বাণিজ্যিক ফসলের জনপ্রিয়তার কারণে খোদ ইথিওপিয়াতেই এই উদ্ভিদের চাষের পরিধি কিছুটা কমে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক খাদ্যঝুঁকি এড়াতে গুটিকয়েক প্রধান ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানোর তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এনসেটের মতো অবহেলিত উদ্ভিদগুলোকে যথাযথ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করা গেলে বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থায় এক অনন্য বৈচিত্র্য আনা সম্ভব। সামান্য অনুকূল পরিবেশ এবং সচেতনতা পেলে এই অলৌকিক উদ্ভিদটি একদিন মানবজাতির ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠতে পারে।