বিশ্বের সিংহভাগ দেশ যখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে সময় গণনা করছে, তখন আফ্রিকা মহাদেশের দেশ ইথিওপিয়ায় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্যে দাবি করা হয়েছে যে, বিশ্বজুড়ে নির্দিষ্ট সাল চললেও ইথিওপিয়ার নিজস্ব সময় গণনার পদ্ধতি অনুযায়ী তারা কয়েক বছর পিছিয়ে রয়েছে। দেশটির নিজস্ব এই সময় কাঠামো নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। মূলত ঐতিহ্যবাহী গিজ ক্যালেন্ডার ব্যবহারের কারণেই এই ভিন্নতা তৈরি হয়েছে, যা প্রাচীন কপটিক ক্যালেন্ডারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ইথিওপিয়ায় যিশু খ্রিষ্টের জন্মসনকে পশ্চিমা বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের তুলনায় সাত থেকে আট বছর পরের হিসাব হিসেবে ধরা হয়। প্রাচীন রোমান চার্চ তাদের সময় গণনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনলেও ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স চার্চ যুগ যুগ ধরে তাদের প্রাচীন হিসাব পদ্ধতিই বজায় রেখে চলেছে। দীর্ঘ ইতিহাসে কখনো ঔপনিবেশিক শাসনের শিকার না হওয়ায় দেশটি নিজেদের স্বকীয় সংস্কৃতি, বর্ণমালা ও ক্যালেন্ডার সফলভাবে ধরে রাখতে পেরেছে। প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো এই ক্যালেন্ডার ব্যবস্থায় বছর গণনার ক্ষেত্রে মোট ১৩টি মাস রয়েছে।

ইথিওপিয়ার এই ১৩ মাসের ক্যালেন্ডারে প্রথম ১২টি মাসের প্রতিটিতে ৩০ দিন করে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ১৩তম মাস ‘পাগুমে’ গঠিত হয় মাত্র পাঁচ বা ছয় দিনে। দেশটির এমন ব্যতিক্রমী সময় কাঠামো পর্যটকদের জন্য দারুণ কৌতূহলোদ্দীপক হলেও স্থানীয় বাসিন্দারা এর কারণে নানা জটিলতায় পড়েন। আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেককেই পশ্চিমা ও স্থানীয়—উভয় ক্যালেন্ডারের সঙ্গেই নিয়মিত মানিয়ে চলতে হয়। এমনকি জন্মসনদ তৈরি কিংবা দাপ্তরিক নথিপত্র প্রস্তুত করার সময় দুটি ভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে সমন্বয় করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এই ভিন্ন ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা মানুষেরা ইথিওপিয়ান ক্যালেন্ডারকেই নিজেদের জীবনধারার সঙ্গে বেশি মানানসই বলে মনে করেন। ইথিওপিয়ায় নববর্ষ বা ‘এনকুতাতাশ’ উদ্‌যাপিত হয় ১১ সেপ্টেম্বর, যে সময়টিতে বর্ষাকাল শেষ হয়ে চারপাশ সবুজ ও রৌদ্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দেশটির মানুষের কাছে শীতের শুষ্ক মৌসুমের ১ জানুয়ারির চেয়ে বর্ষার ঠিক পরপরই নতুন বছর শুরু হওয়া অনেক বেশি যৌক্তিক বলে মনে হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন ক্যালেন্ডার ব্যবহারের নজির থাকলেও ইথিওপিয়ার এই প্রাচীন ও স্বকীয় সময় গণনারর ঐতিহ্য বিশ্বজুড়ে এক অনন্য সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পরিচয় বহন করে।