মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত কৌশলগত এবং সংবেদনশীল হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে একটি অত্যাধুনিক উচ্চক্ষমতার লেজার অস্ত্র মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত আকাশপথে সম্ভাব্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক ড্রোন খুব সহজেই প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে এই বিশেষ প্রযুক্তিটি মাঠে নামানো হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ এই সামরিক পদক্ষেপের সত্যতা নিশ্চিত করেছে এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যেসব ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তার তুলনায় লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে অত্যন্ত কম খরচে আকাশপথের এই হুমকিগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব বলে দাবি করা হচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি উন্নত করেছে মার্কিন গবেষকরা এবং বর্তমানে এর সক্ষমতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ এগিয়ে রয়েছে।

প্রযুক্তির দিক থেকে লেজার অস্ত্র পরিচালনার পদ্ধতিটি বেশ অভিনব এবং ব্যয় সাশ্রয়ী। প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য আলাদাভাবে কোনো ভৌত ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টর ছুড়তে হয় না, ফলে সামগ্রিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এই অস্ত্রটি জেনারেটর কিংবা শক্তিশালী ব্যাটারি থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে সেটিকে অতি তীব্র আলোকরশ্মিতে রূপান্তর করে থাকে। পরবর্তীতে অত্যন্ত ঘনীভূত সেই রশ্মি নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর ওপর নিক্ষেপ করা হয়, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো ড্রোন বা আকাশযানের সংবেদনশীল অংশ অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যায়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিরেক্টেড এনার্জি কনসালট্যান্টসের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, এই ব্যবস্থা ড্রোনের গতিপথ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে এর সেন্সর অকার্যকর করতে বা সম্পূর্ণ যানটি গুঁড়িয়ে দিতে দারুণভাবে সক্ষম।

এই লেজার ব্যবস্থার অন্যতম একটি আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ দিক হলো, এটি পরিচালনার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী কোনো জটিল নতুন যন্ত্রপাতি তৈরি না করে বরং পুনর্গঠিত এক্সবক্স কন্ট্রোলার ব্যবহার করছে। সামরিক বাহিনীর যুক্তি হলো, লক্ষ্যবস্তু নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আগে থেকেই ভিডিও গেম শিল্পে সফলভাবে তৈরি রয়েছে, তাই নতুন করে কন্ট্রোল সিস্টেম উদ্ভাবনের পেছনে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করার কোনো প্রয়োজন নেই। মার্কিন যুদ্ধজাহাজে এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের পাশাপাশি মেক্সিকোর মাদক কার্টেলবিরোধী অভিযানেও এর ব্যবহারের নজির রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মানবদেহের বিরুদ্ধে সরাসরি এই অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে পারে এবং এর ফলে সেনাদের অতিরিক্ত গোলাবারুদ মজুত করার প্রয়োজনীয়তা অনেক কমে যাবে।

তবে এত সব সুবিধার পরেও এই প্রযুক্তির কিছু দৃশ্যমান সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বর্তমানের লেজার সিস্টেমগুলোর আকার ও ওজন বেশ ভারী হওয়ার কারণে এগুলো সৈন্যদের ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের উপযোগী নয় এবং বড় যুদ্ধজাহাজেই কেবল স্থাপন করতে হয়। তা ছাড়া, লেজার রশ্মি কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য সাধারণত পরিষ্কার আকাশের প্রয়োজন পড়ে এবং একসঙ্গে যদি বিপুলসংখ্যক ড্রোন ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ চালায়, তবে একটি একক লেজার ব্যবস্থা সব লক্ষ্যবস্তুকে একই সময়ে মোকাবিলা করতে হিমশিম খেতে পারে। ফলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির আরও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হলেও প্রচলিত ও বহুমুখী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শতভাগ বিকল্প হিসেবে লেজার একা যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে এখনও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।