কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলায় মাদকের টাকার জন্য নিজের পরিবারে বিভীষিকা তৈরি করার এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার বড়খারচর মহল্লায় মাদকাসক্ত বড় ছেলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রুবিনা বেগম নামের এক মা প্রশাসনের কাছে নিজের সন্তানের ফাঁসি অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দাবি করেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত ফুল মিয়া দীর্ঘদিন ধরে নেশার টাকার জন্য পরিবারের সদস্যদের ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। সর্বশেষ সম্প্রতি রাতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মা ও বোনকে মারধরের পর তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে নিজ ঘরে অগ্নিসংযোগ করেন। আগুনে পুরো পরিবারটি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে এবং তাদের পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, অভিযুক্ত ফুল মিয়া বাড়ির সামনে একটি দোকানে বাকিতে পণ্য চান এবং দোকানদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করেন। ওই দোকানদার সম্পর্কে তাঁর দাদা হন এবং এই ঘটনার প্রতিবাদ করায় ফুল মিয়া তাঁর বাবা আবু বক্কর, মা রুবিনা বেগম ও বোনের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে বোনকে মারধর করার পাশাপাশি মা রুবিনা বেগমকে দা নিয়ে কোপাতে উদ্যত হন তিনি। প্রাণ বাঁচাতে মা পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে স্থানীয় লোকজনকে ডাকতে গেলে সুযোগ বুঝে ঘরের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনে ঘরের আসবাবপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, বই-খাতা এবং ঘরের ভেতর আটকে থাকা প্রায় ১৫টি হাঁস ও ৪০টি দেশি মুরগি পুড়ে মারা যায়।
খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত এগিয়ে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা শুরু করেন এবং পরে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে। অভিযুক্তের ছোট ভাই দিপু জানান, তারা চার ভাই জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকেন এবং বড় ভাই বাড়িতে থেকে প্রতিনিয়ত বাবা-মাকে নির্যাতন করে তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাবা আবু বক্কর অত্যন্ত কষ্টভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান, নিজের সন্তান এভাবে তাদের পথে বসাবে তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি এবং পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি আইনি ব্যবস্থা ও ছেলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে অভিযুক্ত ফুল মিয়াকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ফুল মিয়া অবশ্য নিজের অপরাধের দায় এড়িয়ে উল্টো পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে তাঁকে হেনস্তা করার অভিযোগ তোলার চেষ্টা করেছেন। তিনি দাবি করেন, পরিবারের লোকজন তাঁকে সবসময় কাজ না করার জন্য বকাঝকা করতেন এবং ঘরে তাঁরও অংশ রয়েছে জেনেই তিনি এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তবে কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন যে, ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। মাদকাসক্তির করাল গ্রাস যে একটি হাসিখুশি পরিবারকে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারে, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি তারই এক নির্মম বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।