বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের বন্যপ্রাণীর মাংস ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে রোগ সারানোর প্রাচীন লোকবিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সমাজের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে এমন ধারণা প্রচলিত আছে যে, বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রোগের নিরাময় লুকিয়ে রয়েছে এসব বন্য উপাদানের মধ্যে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ জনপদে হাতুড়ে চিকিৎসক বা কবিরাজদের প্ররোচনায় সাধারণ মানুষ এই অপ্রমাণিত চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর ভরসা করে আসছেন। অথচ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই সমস্ত বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা সত্যতা নেই।

আমাদের সমাজে প্রচলিত এই অন্ধবিশ্বাসের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে শিয়ালের মাংস খাওয়ার প্রচলন, যা নিয়ে অনেকের ধারণা এটি খেলে বাতের ব্যথা চিরতরে দূর হয়। একইভাবে, তক্ষক নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই; হাঁপানি রোগ থেকে শুরু করে মানুষের যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি—সবক্ষেত্রেই তক্ষকের ব্যবহার জাদুকরী ফল দেয় বলে প্রচার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের বাত ও শারীরিক ব্যথা সারাতে জোঁকের তেল ব্যবহারের প্রচলনও বেশ পুরনো। বহু মানুষ এসব বুনো উপাদানকে মহৌষধ মনে করে নিয়মিত সেবন বা ব্যবহার করে থাকেন, যা প্রকারান্তরে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, এ ধরনের বন্যপ্রাণীর মাংস বা দেহাংশ খাওয়ার ফলে রোগ তো ভালো হয়ই না, বরং নানা ধরনের মারাত্মক সংক্রমণ বা রোগ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক প্রাণী বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বাহক হয়ে থাকে, যা মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রমাণিত হতে পারে। তক্ষক বা শিয়ালের মতো বন্যপ্রাণী থেকে মানবদেহে জলাতঙ্ক বা অন্যান্য জটিল জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা প্রবল থাকে। তাছাড়া জোঁকের তেল ত্বকে ব্যবহার করার ফলে মারাত্মক অ্যালার্জি কিংবা ইনফেকশনের মতো চর্মরোগ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিজ্ঞানসম্মত ও পরীক্ষিত চিকিৎসার পরিবর্তে এ ধরনের অপচিকিৎসার ওপর নির্ভর করার ফলে অনেক সময় রোগীরা সঠিক সময়ে প্রকৃত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলে সাধারণ ও নিরাময়যোগ্য রোগও অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক রূপ ধারণ করে রোগীর জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে এসে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করা অত্যন্ত জরুরি। বন্যপ্রাণী রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করার মাধ্যমে এই অপচিকিৎসার প্রসার রোধ করা এখন সময়ের দাবি।