যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ফুটবল লিগ এনএফএলে ফিলিস্তিনি শিশুদের স্মরণে নিজের অবস্থান থেকে একচুলও নড়ছেন না হিউস্টন টেক্সান্সের তারকা লাইনব্যাকার আজিজ আল-শাইর। সম্প্রতি ইন্ডিয়ানাপোলিস কোল্টসের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি মাঠে নেমেছিলেন চোখের নিচে ফিলিস্তিনের গাজায় নিহত দুই শিশুর নাম খোদাই করে। এর আগেও লিগ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাকে বহুবার সতর্ক করা হয়েছে এবং বিভিন্ন বার্তা প্রদর্শনের দায়ে আর্থিক জরিমানাও গুনতে হয়েছে। তবুও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে প্রাণ হারানো নিষ্পাপ শিশু বিশেষ করে লানা ও বানার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিনি কোনো দ্বিধা করেননি। তার এমন মানবিক ও সাহসী পদক্ষেপ ক্রীড়াজগতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং মানবাধিকার কর্মীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ বিমান হামলায় প্রাণ হারায় ১২ বছর বয়সী লানা ও তার ৮ বছর বয়সী বোন বানাসহ তাদের পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। তাদের এই মর্মান্তিক মৃত্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নামিয়ে আনে এবং আল-শাইর ব্যক্তিগতভাবে এই ঘটনায় গভীরভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠেন। এর ধারাবাহিকতায় তিনি মাঠের খেলায় নিজের শারীরিক উপস্থিতি এবং সাজসজ্জাকে ফিলিস্তিনি শিশুদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। এর আগে গত বছরের বিভিন্ন ম্যাচ চলাকালীন সময়েও তিনি তার পোশাক ও খেলার সরঞ্জামে ফিলিস্তিনের পক্ষে নানা বার্তা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। বিশেষ করে শিশু হিন্দ রাজাব এবং ওয়াফা আকিলার মতো মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হওয়া নামগুলো তিনি নিজের চোখের নিচে কালি দিয়ে লিখে মাঠে নেমেছিলেন।
খেলার মাঠে রাজনৈতিক বা সংবেদনশীল বার্তা প্রদর্শনের ওপর এনএফএল কর্তৃপক্ষের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং আল-শাইর অতীতে এই নিয়ম ভাঙার দায়ে বড় অঙ্কের জরিমানা গুনেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পিটসবার্গ স্টিলার্সের বিপক্ষে একটি প্লে-অফ ম্যাচে চোখের নিচে ‘স্টপ দ্য জেনোসাইড’ বা গণহত্যা বন্ধের আহ্বান লিখে মাঠে নামায় তাকে প্রায় সাড়ে এগারো হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। এমনকি নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের বিপক্ষে অন্য একটি ম্যাচের আগে ওয়ার্মআপের সময় একই ধরনের বার্তা প্রদর্শন করলে লিগ কর্তারা তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এই লেখা না মুছলে তাকে খেলতে দেওয়া হবে না। কিছু ক্ষেত্রে ম্যাচ চলাকালে কর্তৃপক্ষের চাপে বাধ্য হয়ে তাকে সেই বার্তা মুছে ফেলতে হয়েছে অথবা জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তবে কর্তৃপক্ষের এই কঠোর নীতি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আল-শাইরের মানবিক চেতনাকে দমাতে পারেনি বরং তিনি আরও দৃঢ়তার সঙ্গে ফিলিস্তিনি শিশুদের কথা স্মরণ করে যাচ্ছেন। খেলাধুলার আন্তর্জাতিক মঞ্চ ব্যবহার করে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করার এই অভিনব প্রচেষ্টা তাকে কেবল একজন সাধারণ ক্রীড়াবিদের চেয়ে অনেক উঁচুতে স্থান দিয়েছে। ফিলিস্তিন চিলড্রেনস রিলিফ ফান্ডের মতো দাতব্য সংস্থার প্রতি সমর্থন জানানো থেকে শুরু করে নিয়মিত শিশুদের নাম গায়ে মেখে মাঠে নামা—সব মিলিয়ে তিনি সাহসিকতার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন। শত বাধা ও নিয়মের বেড়াজাল সত্ত্বেও নিজের নৈতিক অবস্থান থেকে সরে না দাঁড়ানোর এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে খেলোয়াড়দের কণ্ঠস্বর মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।